প্রিন্ট এর তারিখঃ Oct 17, 2026 || প্রকাশের তারিখঃ Jan 7, 2026
বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়াভিত্তিক ইসলামি কনটেন্ট ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব সংকট
বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়াভিত্তিক ইসলামি কনটেন্ট ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব সংকট
একবিংশ শতাব্দীতে তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি বাংলাদেশের ধর্মীয় প্রচার ও প্রসারের চিরাচরিত কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের মতো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো এখন ইসলামি আলোচনার প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তন একদিকে যেমন ধর্মীয় জ্ঞান সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে, অন্যদিকে তেমনি দেশে প্রচলিত প্রথাগত ধর্মীয় কর্তৃত্বব্যবস্থার ভেতর এক গভীর সংকট তৈরি করেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ রাখলেই অসংখ্য ইসলামি ভিডিও, শর্ট ক্লিপস ও বিতর্কমূলক কনটেন্ট দেখা যায়। ওয়াজ-মাহফিল থেকে শুরু করে মাসআলা-মাসায়েল—সবই এখন ডিজিটাল ফরম্যাটে সহজলভ্য। এসব কনটেন্টের একটি বড় অংশ মানুষের আবেগ ও ধর্মীয় অনুভূতির ওপর ভর করে তৈরি হলেও অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে বেশি ভিউ, লাইক ও ফলোয়ার অর্জন। ফলে ধর্মীয় আলোচনা আত্মিক সংশোধনের মাধ্যম না থেকে ধীরে ধীরে একটি ‘কনটেন্ট পণ্য’তে রূপ নিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানেই শুরু হচ্ছে ধর্মীয় কর্তৃত্ব সংকট। ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশে ফতোয়া বা ধর্মীয় ব্যাখ্যার দায়িত্ব ছিল স্বীকৃত আলেম, মুফতি ও প্রাতিষ্ঠানিক মাদ্রাসাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার হাতে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে এখন যে কেউ নিজেকে ধর্মীয় বক্তা বা বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারছেন। এতে জ্ঞানগত যোগ্যতা ও গবেষণার চেয়ে উপস্থাপনা শৈলী এবং ফলোয়ার সংখ্যাই অনেক সময় ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি হয়ে উঠছে।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, আবেগপ্রবণ বক্তব্যের মাধ্যমে তরুণ বক্তারা বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করছেন, অথচ তাদের বক্তব্যের তাত্ত্বিক ভিত্তি ও নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স দুর্বল। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা আলেম সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
সোশ্যাল মিডিয়ার এই বাস্তবতায় আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো আন্তঃমাজহাবি ও মতাদর্শগত বিভাজন। বিভিন্ন ধারার বক্তারা একে অপরকে আক্রমণ করতে গিয়ে অনেক সময় রুচিহীন ও উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্যে জড়িয়ে পড়ছেন। এসব ভিডিও ভাইরাল হলে অনুসারীদের মধ্যেও অসহিষ্ণুতা ও উগ্রতা বাড়ছে। পাশাপাশি কার্যকর ফ্যাক্ট-চেক ব্যবস্থার অভাবে ভুল ব্যাখ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।
মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও এর প্রভাব গভীর। সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীকে তার পছন্দের কনটেন্টেই আটকে রাখে। ফলে মানুষ ভিন্ন মত বা যুক্তি শোনার সুযোগ হারায়। এই ‘ইকো চেম্বার’ ধর্মীয় সংকীর্ণতাকে আরও উসকে দিচ্ছে এবং সত্যনিষ্ঠ, ভারসাম্যপূর্ণ আলেমদের কণ্ঠস্বর অনেক সময় আড়ালে চলে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সোশ্যাল মিডিয়া নিজেই সংকটের মূল নয়; বরং এর নিয়ন্ত্রণহীন ও দায়িত্বহীন ব্যবহারই সমস্যার উৎস। এই সংকট উত্তরণে আলেম সমাজকে আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ হওয়ার পাশাপাশি গবেষণাভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ উপস্থাপনায় জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে ডিজিটাল লিটারেসি ও তথ্য যাচাইয়ের সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি।
প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা থামানো সম্ভব নয়। তবে সঠিক জ্ঞান, নৈতিক দায়বদ্ধতা ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের মাধ্যমে এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে সমাজ ও ধর্মের কল্যাণে কাজে লাগানোই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
লেখক : মুফতি ইনায়েতুল কারীম
গবেষক ও ইসলামিক মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট